ফুসফুসের ক্যানসারের জন্য আর কোনও চিকিৎসার প্রয়োজন নেই পোপ চতুর্দশ লিওর। বুধবার এ কথা জানিয়েছেন তাঁর চিকিৎসকেরা। গত সপ্তাহে অস্ত্রোপচার করে যে ক্যানসারযুক্ত টিউমারটি সরানো হয়েছিল, পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে সেটি ফুসফুসের নির্দিষ্ট অংশেই সীমাবদ্ধ ছিল। পোপের বয়স ৭১ বছর।
এখনও পর্যন্ত পাওয়া খবরগুলির মধ্যে পরীক্ষার এই ফলই সম্ভবত সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক। এর থেকে ইঙ্গিত মিলছে, লিওর ফুসফুসের ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়েই ধরা পড়েছিল এবং দ্রুত চিকিৎসার মাধ্যমে তা সরানো সম্ভব হয়েছে। আগেও পোপ ও ভ্যাটিকানের তরফে এমনটাই জানানো হয়েছিল। পোপ হওয়ার পর এটিই তাঁর প্রথম বড় স্বাস্থ্যসংকট।
চিকিৎসকেরা আরও জানিয়েছেন, আগামী মাসে তাঁর লাতিন আমেরিকা সফর বাতিল করার মতো ‘কোনও চিকিৎসাগত কারণ নেই’। ১২ দিনের এই সফরে উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও পেরু যাওয়ার কথা তাঁর। উল্লেখ্য, পেরুর নাগরিকত্বও রয়েছে পোপের।
গত ১৩ অক্টোবর অস্ত্রোপচার করে লিওর ডান ফুসফুসের একটি ছোট গুটি এবং ফুসফুসের কিছু অংশ বাদ দেওয়া হয়। তার দু’দিন আগে সেন্ট পিটার্স স্কোয়ারের উপরের বারান্দায় নিয়মিত জনসমক্ষে উপস্থিতির সময় তিনি নিজেই গুটিটি ধরা পড়ার কথা জানিয়েছিলেন। অস্ত্রোপচারের পরে ভ্যাটিকান জানায়, লিও পালমোনারি অ্যাডেনোকার্সিনোমায় আক্রান্ত। এটি এক ধরনের ফুসফুসের ক্যানসার। খবরটি প্রকাশ্যে আসার পর উদ্বেগ ছড়িয়েছিল।
এর পর আরও চিকিৎসার প্রয়োজন হবে কি না, তা নির্ভর করছিল কলাতাত্ত্বিক ও আণবিক জীববিদ্যা-সংক্রান্ত পরীক্ষার ফলের উপর। ক্যানসারের পর্যায় নির্ধারণ এবং সবচেয়ে উপযুক্ত চিকিৎসাপদ্ধতি বেছে নিতে এই পরীক্ষাগুলি করা হয়। বুধবার সেই ফল প্রকাশিত হয়েছে।
পোপের দুই চিকিৎসক লুইজি কার্বোনে ও স্তেফানো মার্গারিতো এক বিবৃতিতে জানান, পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে যে রোগটি পালমোনারি অ্যাডেনোকার্সিনোমা এবং তা ফুসফুসের নির্দিষ্ট অংশেই সীমাবদ্ধ ছিল। তাঁদের কথায়, ‘পরবর্তী ক্যানসার-সংক্রান্ত মূল্যায়নেও নিশ্চিত হয়েছে যে আর কোনও চিকিৎসার প্রয়োজন নেই।’
দ্রুত কাজে ফিরছেন পোপ
অস্ত্রোপচারের পর থেকেই দ্রুত নিজের কাজে ফিরেছেন লিও। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে আলাদা করে ফোনে কথা বলেছেন তিনি।
গত রবিবার, ফুসফুসে গুটি ধরা পড়ার কথা জানানোর এক সপ্তাহের মাথায়, ফের সেন্ট পিটার্স স্কোয়ারে সমবেত জনতার সামনে নিয়মিত অ্যাঞ্জেলাস প্রার্থনা ও আশীর্বাদ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন পোপ। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল জোরালো।
সেখানে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে লিও বলেন, ‘এই অভিজ্ঞতা অসুস্থতা বা শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের সকলের সঙ্গে আমাকে বিশেষ ভাবে একাত্ম করেছে। এই সঙ্কটপূর্ণ পর্ব এখন পিছনে ফেলে এসেছি। ঈশ্বরের সহায়তা এবং আপনাদের প্রার্থনাকে সঙ্গে নিয়ে আমি ধীরে ধীরে আমার কাজকর্ম আবার শুরু করব।’
লিওর অস্ত্রোপচার করেছেন শল্যচিকিৎসক মার্গারিতোরা। ভ্যাটিকানের সরকারি সংবাদমাধ্যম ‘ভ্যাটিকান নিউজ’কে তিনি জানান, পোপের সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া—যার মধ্যে ফুসফুসের আবার প্রসারিত হওয়াও রয়েছে—‘স্বাভাবিক সময়সূচি মেনেই এগোচ্ছে’।
মার্গারিতোরা নিশ্চিত করেছেন, নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষার সময়ই টিউমারটি ধরা পড়েছিল। তাঁর অনুমান, অস্ত্রোপচারের দিন থেকে প্রায় দু’সপ্তাহের মধ্যে লিও ‘সম্পূর্ণ শারীরিক সুস্থতা’ ফিরে পাবেন। অর্থাৎ, ৬ নভেম্বর শুরু হতে চলা লাতিন আমেরিকা সফরের দীর্ঘ বিমানযাত্রা ও ঠাসা কর্মসূচি সামলানোর মতো সুস্থ হয়ে ওঠার কথা তাঁর।
মার্গারিতোরা বলেন, ‘এই ধরনের অস্ত্রোপচারের পরে যাঁদের সুস্থ হয়ে ওঠার প্রবল তাগিদ থাকে, পবিত্র পিতাও তাঁদের মতোই মনপ্রাণ দিয়ে সুস্থ হওয়ার চেষ্টা করেছেন। ফলে আমাদের কাছ থেকে তাঁর খুব সামান্য সহায়তারই প্রয়োজন হয়েছে। দ্রুত সেরে ওঠার ব্যাপারে তাঁর দৃঢ়সংকল্প সব দিক থেকেই কাজে দিয়েছে।’
সফরে কি বাধা হতে পারে শারীরিক ধকল?
পোপকে সাধারণত শারীরিক ভাবে সুস্থ ও কর্মক্ষম বলেই মনে করা হয়। তিনি নিয়মিত টেনিস খেলেন এবং সাঁতার কাটেন। তবে রোমের ইজরায়েলাইট হাসপাতালের ক্যানসার বিশেষজ্ঞ রাফায়েলে অ্যাঞ্জেলো মাদাইওর মতে, ফুসফুসের কিছু অংশ বাদ যাওয়ার সঙ্গে বয়সের প্রভাব মিলিয়ে আগামী কয়েক সপ্তাহে লিওর শারীরিক সক্ষমতা কিছুটা কমতে পারে। উল্লেখ্য, মাদাইও পোপের চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত নন।
সাধারণত পোপের বয়সি কোনও রোগীকে অস্ত্রোপচারের পর এই সময়ে অতিরিক্ত পরিশ্রম না করার পরামর্শ দেওয়া হয়। মাদাইও বলেন, ‘সেরে ওঠার পরে তিনি যদি হালকা সাঁতার কাটতে চান, তা করতে পারেন। কিন্তু শখের ফুটবল ম্যাচে নেমে পড়লে কিছু অসুবিধার মুখে পড়তে পারেন।’
পোপের আসন্ন লাতিন আমেরিকা সফর নিয়েও সতর্ক করেছেন এই বিশেষজ্ঞ। সফরের কর্মসূচিতে পেরুর অনেক উঁচুতে অবস্থিত কুসকো শহরও রয়েছে। সেখানে যাওয়া লিওর পক্ষে কিছুটা কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
মাদাইওর কথায়, ‘উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অত উঁচুতে উঠতে গেলে সমস্যা হতে পারে। সবচেয়ে অনুকূল পরিস্থিতিতেও বিষয়টি এমনিতেই জটিল।’